
দারিদ্র্যকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত আয়ের ঘাটতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থনীতির প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি বা পরিবার ন্যূনতম জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় আয় অর্জন করতে পারে না, তাকেই দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী ড. অমর্ত্য সেন দারিদ্র্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেন।
তিনি যুক্তি দেন যে দারিদ্র্য কেবল অর্থ বা আয়ের অভাব নয়; বরং মানুষের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য ও সুযোগের অভাবই প্রকৃত দারিদ্র্যের মূল কারণ। তাঁর এই ধারণা বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন অর্থনীতি, মানবকল্যাণ গবেষণা এবং দারিদ্র্য বিমোচন নীতিমালাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
অমর্ত্য সেনের “Capability Approach” বা “সামর্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি” আধুনিক উন্নয়ন চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি দেখিয়েছেন যে একই পরিমাণ আয় থাকা সত্ত্বেও দুই ব্যক্তি সমানভাবে জীবনযাপন করতে সক্ষম নাও হতে পারেন। কারণ মানুষের বয়স, স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থান, শিক্ষার সুযোগ, লিঙ্গ, পরিবেশ এবং সামাজিক কাঠামো তাদের জীবনমান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে একজন মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কেবল তার আয়ের পরিমাণ দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং সে কী করতে পারে এবং কী হতে পারে, সেই সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
অমর্ত্য সেনের মতে, মানুষের কল্যাণ পরিমাপের ক্ষেত্রে দুটি ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: “Functionings” এবং “Capabilities”। Functionings বলতে বোঝায় একজন ব্যক্তি বাস্তবে কী করতে পারছে বা কী অবস্থায় রয়েছে। যেমন সুস্থ থাকা, শিক্ষিত হওয়া, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কিংবা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করা।
অন্যদিকে Capabilities হলো এসব অর্জনের সম্ভাবনা বা স্বাধীনতা। অর্থাৎ একজন ব্যক্তির সামনে কতগুলো বাস্তব বিকল্প উন্মুক্ত রয়েছে এবং তিনি কতটুকু স্বাধীনভাবে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, সেটিই তার সামর্থ্যের পরিচয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় যে আয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলেও তা কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। একজন ব্যক্তি পর্যাপ্ত আয় অর্জন করেও যদি উন্নত চিকিৎসা না পান, মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন, সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন কিংবা রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে না পারেন, তাহলে তার জীবনমান প্রকৃত অর্থে উন্নত হয় না।
একইভাবে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের তুলনায় একই জীবনমান অর্জনের জন্য অধিক সম্পদের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আয়কে একমাত্র সূচক হিসেবে গ্রহণ করলে বাস্তব দারিদ্র্যের অনেক দিক আড়াল হয়ে যায়।
দারিদ্র্য সম্পর্কে অমর্ত্য সেনের এই ধারণা দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Poverty and Famines–এ তিনি দেখিয়েছেন যে দুর্ভিক্ষ সব সময় খাদ্যের সামগ্রিক ঘাটতির কারণে ঘটে না। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকলেও জনগণের একটি অংশ সেই খাদ্য ক্রয় বা সংগ্রহ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।
১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান যে, খাদ্য উৎপাদনে বিপর্যয়কর পতন না ঘটলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য পাওয়ার অধিকার ও সামর্থ্য হারানোর কারণে অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। এই গবেষণা বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যনিরাপত্তা সম্পর্কিত প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
অমর্ত্য সেনের সামর্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি মানব উন্নয়নের ধারণাকেও আমূল পরিবর্তন করেছে। উন্নয়নকে তিনি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মানুষের স্বাধীনতা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে যখন মানুষ শিক্ষালাভের সুযোগ পায়, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে, রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারে এবং নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এই লক্ষ্য অর্জনের একটি মাধ্যম মাত্র, লক্ষ্য নয়।
এই চিন্তার প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ১৯৯০ সালে যে মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index বা HDI) চালু করে, তার বৌদ্ধিক ভিত্তি অনেকাংশেই অমর্ত্য সেনের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত। HDI-তে কেবল মাথাপিছু আয় নয়, বরং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে উন্নয়ন পরিমাপের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক সূচকগুলোও গুরুত্ব লাভ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অমর্ত্য সেনের ধারণা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু আয়ের উন্নতি সত্ত্বেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলের বৈষম্য, নারীর ক্ষমতায়নের সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা মানুষের সামর্থ্য বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ফলে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য শুধু আয় বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মৌলিক সেবার সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণাও দেখিয়েছে যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি শুধু বেশি আয়ই করেন না, বরং স্বাস্থ্য সচেতনতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সচেতনতার ক্ষেত্রেও এগিয়ে থাকেন।
একইভাবে সুস্বাস্থ্য একজন ব্যক্তিকে কর্মক্ষম করে তোলে এবং তার জীবনযাপনের সম্ভাবনা সম্প্রসারিত করে। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অমর্ত্য সেনের চিন্তাধারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ কোনো অর্থনৈতিক যন্ত্র নয়; বরং তার নিজস্ব মর্যাদা, অধিকার ও সম্ভাবনা রয়েছে। উন্নয়নের প্রকৃত লক্ষ্য হলো মানুষের সেই সম্ভাবনাগুলোর বিকাশ নিশ্চিত করা। যখন কোনো ব্যক্তি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সে প্রকৃত অর্থেই দরিদ্র, যদিও তার আয় দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তি সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও যদি মৌলিক সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক সমর্থন লাভ করেন, তাহলে তার জীবনমান তুলনামূলকভাবে উন্নত হতে পারে।
সুতরাং, দারিদ্র্যকে কেবল অর্থের সংকট হিসেবে দেখা একটি সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি। ড. অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন যে দারিদ্র্যের মূল সমস্যা হলো মানুষের সামর্থ্য ও স্বাধীনতার সংকোচন। একজন মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সে কতটুকু স্বাধীনভাবে নিজের জীবন গড়তে পারছে এবং তার সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য কতটুকু সুযোগ পাচ্ছে তার ওপর।
এই উপলব্ধি আজকের বিশ্বে দারিদ্র্য, উন্নয়ন এবং মানবকল্যাণ নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে এক মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণের কার্যকর নীতি প্রণয়নের জন্য আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা সম্প্রসারণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষের সামর্থ্য বিকশিত হয় এবং সে নিজের জীবনকে মর্যাদাপূর্ণভাবে পরিচালনা করার বাস্তব সুযোগ লাভ করে
লেখক: ইরফান ইবনে আমিন পাটোয়ারী, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























