, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
নাগরিক শিরোনাম :
জাতীয় ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনে শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ৬-দফা দাবিতে লালপুরে ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সংবাদ সম্মেলন সন্ত্রাস বিরোধী আইনে নিষিদ্ধ আ.লীগের চার নেতা গ্রেফতার গৌরীপুরে খাদ্য গুদাম নির্মাণ কাজে চরম স্থবিরতা অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল সহকর্মীর হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হলেন শিক্ষিকা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় প্রাইভেট শিক্ষক গ্রেফতার ৩০-আঙুল নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর পরিবারকে সহায়তা বর্ণাঢ্য আয়োজন ৭১ টেলিভিশনের ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন দেশবিরোধী অপতৎপরতা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যুবদলের বিক্ষোভ
বিজ্ঞপ্তি :
সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। ঢাকাস্থ অফিসে কম্পিউটার অপারেটর ও পিওন আবশ্যক। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন : 09649-230220 ও মুঠোফোন : 01915-708187

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মোড়ের সূচনা

  • মিনহাজ মোল্লা
  • সর্বশেষ : ০২:১৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৫
  • ১২৭ বার পঠিত

১২ এপ্রিল ২০২৫, মাসকট, ওমান—বিশ্ব রাজনীতির দিকচিহ্নে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রথম সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার এক নতুন জানালা খুলেছে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এই প্রেক্ষাপটে মাসকট বৈঠক কেবল দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা নয়, বরং এটি এক জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের গঠনশীল সূচনা।

পটভূমি : ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) চুক্তি স্বাক্ষরের পর কিছু সময়ের জন্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নতির দিকে এগোয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে আসা এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। ইরান ধীরে ধীরে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে।

মাসকট বৈঠক: প্রতীক না বাস্তব সম্ভাবনা? ওমানের রাজধানী মাসকটে আয়োজিত বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনায় বসেন। যদিও এই আলোচনা ‘প্রতিনিধিদের মাধ্যমে’ শুরু হয়েছিল, বৈঠকের শেষভাগে সরাসরি মুখোমুখি আলোচনা শুরু হয়।

বৈঠকের পর উভয় পক্ষই এই আলোচনাকে “গঠনমূলক” এবং “উৎসাহজনক” হিসেবে আখ্যায়িত করে। মার্কিন হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, “আমরা ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণমূলক সমাধানে আগ্রহী। তবে এই আলোচনা সহজ হবে না।”

সমঝোতার পথে প্রধান বাধাসমূহ : এই আলোচনার মূল জটিলতা দুটি জায়গায়: (১) ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং (২) যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ। ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা অস্ত্র তৈরির মাত্রার খুব কাছাকাছি। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় এই হার ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হোক, যেমনটি ছিল ২০১৫ সালের চুক্তিতে। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, “আপনারা যদি আমাদের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করেন, আমরা বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করতেই পারি।”

প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের দ্বৈত বার্তা : ২০২৫ সালের শুরুতে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তিনি একইসঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “আমরা বারবার প্রতিশ্রুতির ভাঙন দেখেছি। এবার প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই।” অন্যদিকে, মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হঠাৎ করেই বলেন, “আমি হুমকির মুখে কারও সঙ্গে আলোচনা করব না।” এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক হুমকিসুলভ আচরণের প্রতি ঘৃণা ও আস্থাহীনতা স্পষ্ট। এমন অবস্থায় মাসকট বৈঠকে তার সরকার প্রতিনিধিদের পাঠানো একপ্রকার বাস্তববাদী কৌশল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমীকরণ, ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি আদর্শিক ঘাঁটি। শিয়া মতবাদ, ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থান, হিজবুল্লাহ ও হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থন, সিরিয়া ও ইরাকের সংঘাতে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ইরানের ভূমিকা এ অঞ্চলে অত্যন্ত প্রভাবশালী। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান হচ্ছে একটি “কৌশলগত হুমকি”, বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগের কারণে। আবার, একইসঙ্গে ইরান একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীও, বিশেষ করে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংকট বা সৌদি-ইরান সম্পর্ক উন্নয়নে।

চীন ও রাশিয়ার প্রভাব:  এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে চীন ও রাশিয়ার বড় ধরনের ভূমিকাও। চীন ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করিয়ে নিজেকে ‘পিস-মেকার’ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরানের ড্রোন সহায়তার জন্য তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে ইরানকে একঘরে রাখার নীতি পরিত্যাগ করে, বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হাঁটতেই হবে। মাসকট বৈঠক সেই পথের প্রথম ধাপ হতে পারে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট: ১. আংশিক চুক্তি ও পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: উভয় পক্ষ ধীরে ধীরে কিছু বিষয়ে সম্মত হয়ে আলাদা আলাদা চুক্তিতে আসতে পারে। এতে করে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।

২. পুরোপুরি চুক্তি ও ২০১৫ সালের JCPOA পুনরায় কার্যকর: এটি সবচেয়ে আদর্শিক ও আশাব্যঞ্জক দৃশ্যপট, তবে বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অনেকটাই কষ্টসাধ্য।

৩.আলোচনা ব্যর্থ হয়ে নতুন করে সংঘাত: যদি আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয়, তাহলে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

উপসংহার:  ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মাসকট বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যকে হয়তো একটি নতুন দিগন্তের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এ পথ সহজ নয়, বরং এটি কাঁটায় ভরা। এই বৈঠক শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং তা বিশ্বশান্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মানবতার ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আলোচনার টেবিলে বসা মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়—তবে সেটিই প্রথম ধাপ। এই মুহূর্তে প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি, পারস্পরিক সম্মান ও দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার প্রতি অঙ্গীকার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে, তবে তাদের অতীতের ভূতের সঙ্গে লড়তে হবে, এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব অপেক্ষা করছে পরবর্তী বৈঠকের দিকে। সম্ভবত, সেই বৈঠকই নির্ধারণ করবে—এই বৈঠক ছিল ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা, নাকি ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত।

 

আরও খবর :
জনপ্রিয়

জাতীয় ভিটামিন ‘এ প্লাস’ ক্যাম্পেইনে শিশুকে ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মোড়ের সূচনা

সর্বশেষ : ০২:১৫:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৫

১২ এপ্রিল ২০২৫, মাসকট, ওমান—বিশ্ব রাজনীতির দিকচিহ্নে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রথম সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সম্ভাবনার এক নতুন জানালা খুলেছে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এই প্রেক্ষাপটে মাসকট বৈঠক কেবল দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা নয়, বরং এটি এক জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের গঠনশীল সূচনা।

পটভূমি : ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) চুক্তি স্বাক্ষরের পর কিছু সময়ের জন্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নতির দিকে এগোয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে আসা এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। ইরান ধীরে ধীরে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে, যা তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে।

মাসকট বৈঠক: প্রতীক না বাস্তব সম্ভাবনা? ওমানের রাজধানী মাসকটে আয়োজিত বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ প্রথমবারের মতো মুখোমুখি আলোচনায় বসেন। যদিও এই আলোচনা ‘প্রতিনিধিদের মাধ্যমে’ শুরু হয়েছিল, বৈঠকের শেষভাগে সরাসরি মুখোমুখি আলোচনা শুরু হয়।

বৈঠকের পর উভয় পক্ষই এই আলোচনাকে “গঠনমূলক” এবং “উৎসাহজনক” হিসেবে আখ্যায়িত করে। মার্কিন হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, “আমরা ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণমূলক সমাধানে আগ্রহী। তবে এই আলোচনা সহজ হবে না।”

সমঝোতার পথে প্রধান বাধাসমূহ : এই আলোচনার মূল জটিলতা দুটি জায়গায়: (১) ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং (২) যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ। ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে, যা অস্ত্র তৈরির মাত্রার খুব কাছাকাছি। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় এই হার ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হোক, যেমনটি ছিল ২০১৫ সালের চুক্তিতে। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, “আপনারা যদি আমাদের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করেন, আমরা বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করতেই পারি।”

প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের দ্বৈত বার্তা : ২০২৫ সালের শুরুতে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে তিনি একইসঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “আমরা বারবার প্রতিশ্রুতির ভাঙন দেখেছি। এবার প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চাই।” অন্যদিকে, মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হঠাৎ করেই বলেন, “আমি হুমকির মুখে কারও সঙ্গে আলোচনা করব না।” এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক হুমকিসুলভ আচরণের প্রতি ঘৃণা ও আস্থাহীনতা স্পষ্ট। এমন অবস্থায় মাসকট বৈঠকে তার সরকার প্রতিনিধিদের পাঠানো একপ্রকার বাস্তববাদী কৌশল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমীকরণ, ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি একটি আদর্শিক ঘাঁটি। শিয়া মতবাদ, ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থান, হিজবুল্লাহ ও হুথি বিদ্রোহীদের সমর্থন, সিরিয়া ও ইরাকের সংঘাতে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে ইরানের ভূমিকা এ অঞ্চলে অত্যন্ত প্রভাবশালী। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান হচ্ছে একটি “কৌশলগত হুমকি”, বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগের কারণে। আবার, একইসঙ্গে ইরান একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীও, বিশেষ করে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংকট বা সৌদি-ইরান সম্পর্ক উন্নয়নে।

চীন ও রাশিয়ার প্রভাব:  এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে চীন ও রাশিয়ার বড় ধরনের ভূমিকাও। চীন ইতোমধ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করিয়ে নিজেকে ‘পিস-মেকার’ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইরানের ড্রোন সহায়তার জন্য তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে চায়, তবে ইরানকে একঘরে রাখার নীতি পরিত্যাগ করে, বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হাঁটতেই হবে। মাসকট বৈঠক সেই পথের প্রথম ধাপ হতে পারে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দৃশ্যপট: ১. আংশিক চুক্তি ও পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: উভয় পক্ষ ধীরে ধীরে কিছু বিষয়ে সম্মত হয়ে আলাদা আলাদা চুক্তিতে আসতে পারে। এতে করে ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে।

২. পুরোপুরি চুক্তি ও ২০১৫ সালের JCPOA পুনরায় কার্যকর: এটি সবচেয়ে আদর্শিক ও আশাব্যঞ্জক দৃশ্যপট, তবে বাস্তবতা বিবেচনায় এটি অনেকটাই কষ্টসাধ্য।

৩.আলোচনা ব্যর্থ হয়ে নতুন করে সংঘাত: যদি আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয়, তাহলে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

উপসংহার:  ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মাসকট বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যকে হয়তো একটি নতুন দিগন্তের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এ পথ সহজ নয়, বরং এটি কাঁটায় ভরা। এই বৈঠক শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং তা বিশ্বশান্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মানবতার ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আলোচনার টেবিলে বসা মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়—তবে সেটিই প্রথম ধাপ। এই মুহূর্তে প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি, পারস্পরিক সম্মান ও দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার প্রতি অঙ্গীকার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে, তবে তাদের অতীতের ভূতের সঙ্গে লড়তে হবে, এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব অপেক্ষা করছে পরবর্তী বৈঠকের দিকে। সম্ভবত, সেই বৈঠকই নির্ধারণ করবে—এই বৈঠক ছিল ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠা, নাকি ইতিহাসের মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত।