, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
নাগরিক শিরোনাম :
বিজ্ঞপ্তি :
সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। ঢাকাস্থ অফিসে কম্পিউটার অপারেটর ও পিওন আবশ্যক। আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। হটলাইন : 09649-230220 ও মুঠোফোন : 01915-708187

পত্রিকার বিজ্ঞাপন হারিয়ে গেছে, প্রতারকরা দখল করেছে অনলাইন

ডিজিটাল যুগ মানুষের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ঘরে বসে এখন ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন—সবকিছুই করা যায় অনলাইনে। বেচাকেনাও তার বাইরে নয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপেও এখন গড়ে উঠেছে বিশাল এক ভার্চুয়াল বাজার। এই বাজারে পণ্যের অভাব নেই, ক্রেতার অভাব নেই, বিজ্ঞাপনেরও অভাব নেই। কিন্তু যার সবচেয়ে বেশি অভাব, সেটি হলো বিশ্বাস।
বাংলাদেশে অনলাইন বেচাকেনা এখন এক বিরাট অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দিনে দিনে বাড়ছে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা, বাড়ছে ডিজিটাল পেমেন্ট, আর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রতারণা। একসময় বাজার মানে ছিল দোকান, দোকানি, আর ক্রেতার চোখে চোখ রেখে লেনদেন। এখন সেই বাজার চলে এসেছে এক স্ক্রিনের মধ্যে—অচেনা এক ‘ডিজিটাল দোকানে’, যেখানে পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে ভুয়া প্রতিশ্রুতি, মিথ্যা হাসি আর নকল ব্র্যান্ড।
প্রতারণা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,আমরা আমাদের পরিচয় ও ফোন নাম্বার অচেনা প্রতারকের হাতে নিজ ইচ্ছায় দিচ্ছি অনলাইনের কৌশলে। অনলাইন বেচাকেনা মানেই যেন অনিশ্চয়তার খেলা। কেউ পোশাক কিনে পাচ্ছেন ছেঁড়া কাপড়, কেউ ফোন অর্ডার দিয়ে পাচ্ছেন সাবান বা ইট, কেউ আবার টাকা পাঠিয়েই হারিয়ে ফেলছেন বিক্রেতার নাম-ঠিকানা। এ যেন এক ভয়াবহ ‘নীরব ডাকাতি’—যা ঘটে আলো-আঁধারির কোনো গলিতে নয়, ঘটে প্রতিদিন কোটি মানুষের ব্যবহৃত ডিজিটাল স্ক্রিনে।
এই প্রতারণার ধরন যেমন বহুমাত্রিক, শিকারও তেমনি বহুবয়সী। কিশোর-তরুণেরা প্রতারিত হচ্ছে অনলাইন গেমিং, বিনিয়োগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা “সহজে টাকা আয়” প্রকল্পে। মধ্যবয়সীরা পড়ছেন ই-কমার্স, চাকরির বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ডেড পণ্যের অফারে। আবার বয়স্ক মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন ব্যাংকিং বা মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিসের ভুয়া কল ও মেসেজে। সবাই ভেবেছেন, “এটা হয়তো সত্যি”—আর ঠিক সেই বিশ্বাসের সুযোগই নিচ্ছে প্রতারক চক্রগুলো।
প্রতারণার মূল শেকড় প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের মনস্তত্ত্বে। মানুষ সহজে কিছু পেতে চায়, দ্রুত লাভে বিশ্বাস করে, ‘অফার’ শব্দ শুনলে উত্তেজিত হয়। প্রতারকরা এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা জানে, মানুষ লোভে নয়, বিশ্বাসেই ফাঁদে পড়ে। তাই ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল রিভিউ, সুন্দর প্যাকেজিং, এবং “অফিশিয়াল লুক” দিয়ে তৈরি করা হয় বিশ্বাসের মায়া। ক্রেতা ভাবে, “এতো সুন্দর ডিজাইন করা, নিশ্চয়ই সত্যি।” অথচ সেই ডিজাইনই প্রতারণার মুখোশ।
একসময় পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন মানে ছিল নির্ভরযোগ্যতা। বড় ব্র্যান্ড, পরিচিত কোম্পানি, নিবন্ধিত ব্যবসায়ী—এরা সবাই তাদের পণ্য প্রচার করত সংবাদপত্রের মাধ্যমে। মানুষ জানত, পত্রিকার বিজ্ঞাপন মানে কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা আছে। এখন সেই বিজ্ঞাপন হারিয়ে গেছে। সংবাদপত্রের শেষ পাতাগুলো এখন ফাঁকা, কারণ বিজ্ঞাপন চলে গেছে অনলাইনে। পত্রিকার বিজ্ঞাপন কমেছে, কিন্তু প্রতারণার বিজ্ঞাপন বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এখন বিজ্ঞাপনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক। এখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই হয় না; শুধু দেখা হয় কে বেশি টাকা দিয়েছে বিজ্ঞাপনের জন্য। ফলে যে কেউ, এমনকি প্রতারকও, টাকা দিলেই তার বিজ্ঞাপন লাখো মানুষের টাইমলাইনে চলে আসে। কেউ ভুয়া ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করছে, কেউ আসল কোম্পানির লোগো কপি করছে, কেউ আবার এমনভাবে ভিডিও বানাচ্ছে যেন সেটা কোনো বিদেশি পণ্য। কিন্তু পেছনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।
আজ পত্রিকার পাতায় পণ্যের বিজ্ঞাপন কমে গেছে, কিন্তু অনলাইনে বিজ্ঞাপনের বন্যা। পার্থক্য একটাই—পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের দায় ছিল, অনলাইনে নেই। পত্রিকার সম্পাদক জানতেন, মিথ্যা বিজ্ঞাপন ছাপালে তার প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোনো সম্পাদক নেই, কোনো যাচাইকারী নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। ফলে প্রতারকরা কার্যত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে। তারা আজ এক নামে প্রতারণা করে, কাল অন্য নামে নতুন পেজ খুলে আবার শুরু করে। এই অদৃশ্য বাজারে প্রতারণা যেন এখন এক প্রকার ব্যবসা। নেই দোকান, নেই লাইসেন্স, নেই স্থায়ী ঠিকানা—তবু চলছে কোটি টাকার লেনদেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ‘ছায়াবাজারে’ আইন পৌঁছাতে পারে না, পুলিশ জানে না কাকে ধরবে, আর সাধারণ মানুষ বুঝে ওঠে না কাকে বিশ্বাস করবে। বাংলাদেশে করোনাকালের পর অনলাইন বেচাকেনার অভ্যাস ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মানুষ ঘরে বসেই পণ্য কিনতে শিখেছে, ব্যাংক বা বিকাশে টাকা পাঠিয়ে অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু সেই অভ্যাসের সুযোগ নিয়েছে প্রতারকরা। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ খুব অল্প সংখ্যক মানুষই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে। অনেকে ভাবে—“অভিযোগ দিয়েই বা কি হবে?”—ফলে এই নীরবতা প্রতারণাকে আরও সাহসী করে তোলে। সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিকও। যখন সমাজে বারবার প্রতারণা ঘটে এবং কেউ জবাবদিহি করে না, তখন একধরনের বিশ্বাসহীন সংস্কৃতি তৈরি হয়। মানুষ একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে, কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ সমাজ টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপরেই। এই বিশ্বাস যখন ক্ষয় হয়, তখন শুধু অনলাইন বাজার নয়, গোটা সামাজিক সম্পর্কই ভেঙে পড়ে।
প্রতারণার অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। একজন ক্রেতা প্রতারিত হলে সে পরেরবার আর অনলাইনে কেনাকাটা করতে চায় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সৎ ব্যবসায়ীরা, যারা সত্যিকারভাবে অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। আজ বাংলাদেশে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা সৎভাবে ব্যবসা করছেন, ভালো পণ্য বিক্রি করছেন, কিন্তু কিছু প্রতারকের কারণে সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতার।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন বাণিজ্য এখন জাতীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ এখনো দুর্বল। সরকারকে এই খাতকে আনতে হবে নিবন্ধন ও পর্যবেক্ষণের আওতায়। প্রতিটি অনলাইন বিক্রেতার জন্য থাকতে হবে বৈধ ব্যবসায়িক পরিচয়, ট্রেড লাইসেন্স, যোগাযোগের তথ্য ও কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিশেষ সাইবার ইউনিট থাকতে হবে, যারা দ্রুত অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতারক ধরা পড়ে, কিন্তু কিছুদিন পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবার আগের কাজে ফিরে যায়। এই চক্রকে ভাঙতে হলে জরুরি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তবু এর চেয়ে বেশি জরুরি হলো সচেতনতা—কারণ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, শেষ পর্যন্ত প্রতারণা ঠেকাতে পারে শুধু সচেতন মানুষ।
একজন ক্রেতা যদি জানেন কীভাবে নিরাপদ লেনদেন করতে হয়, তিনি প্রতারিত হবেন না। অজানা ওয়েবসাইটে প্রিপেমেন্ট না করা, অচেনা লিংকে ক্লিক না করা, বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করা—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। স্কুল ও কলেজে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এখন সময়ের দাবি। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের হাতে থাকবে দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ; যদি তারা নিরাপত্তা না জানে, তবে প্রযুক্তি তাদের হাতেই বিপদ হয়ে উঠবে।
প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বও। আমরা অনেক সময় প্রতারণার ঘটনা শুনে হাসাহাসি করি বা বলি “নিজের দোষেই হয়েছে।” কিন্তু ভুলে যাই—এই প্রতারণা একদিন আমাদের কাছেও ফিরে আসতে পারে। সমাজে যখন কেউ নিরাপদ নয়, তখন কেউই আসলে নিরাপদ নয়।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় পুঁজি টাকা নয়, বিশ্বাস। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু সেই সংযোগকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপাদান হলো সততা। যদি সেটি হারিয়ে যায়, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সমাজ ততই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। অনলাইন প্রতারণা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি আমাদের নৈতিকতা, আস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আঘাত।
আজ প্রয়োজন ডিজিটাল বাজারে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কার। অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে, বিজ্ঞাপনদাতাকে শনাক্তযোগ্য করতে হবে, আর প্রতিটি প্ল্যাটফর্মকে আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রতারণা চলতেই থাকবে, আর সাধারণ মানুষ হারাবে আরও অনেক কিছু—অর্থ, সময়, আত্মবিশ্বাস, এমনকি সমাজের প্রতি আস্থা।
একটি সমাজ তখনই টিকে থাকে, যখন সেখানে সততার দাম থাকে। অনলাইন বেচাকেনা এখন শুধু বাণিজ্য নয়, এটি আমাদের সভ্যতার পরীক্ষা। আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব মানবকল্যাণে, নাকি প্রতারণার অস্ত্রে পরিণত করব—সেই সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই নিতে হবে। বিশ্বাসই এই যুগের নতুন মুদ্রা। এই বিশ্বাস যদি আমরা হারাই, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশও কেবল প্রযুক্তির খোলস হয়ে থাকবে, যার ভেতর থাকবে শূন্যতা, সন্দেহ আর ক্ষোভ। তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—বিক্রি করব শুধু পণ্য নয়, বিক্রি করব সততা, বিশ্বাস আর মানবিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য—যা কিনে পাওয়া যায় না, কিন্তু হারালে সবকিছু হারিয়ে যায়।

মোঃ শামীম মিয়া, শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ ও কলামিস্ট, আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা।

Shamimmiabd94@gmail.com

আরও খবর :
জনপ্রিয়

জলবায়ু ন্যায্যতা, কমিউনিটি নেটওয়ার্কিং প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা

পত্রিকার বিজ্ঞাপন হারিয়ে গেছে, প্রতারকরা দখল করেছে অনলাইন

সর্বশেষ : ০৫:৪৬:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫

ডিজিটাল যুগ মানুষের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ঘরে বসে এখন ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন—সবকিছুই করা যায় অনলাইনে। বেচাকেনাও তার বাইরে নয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপেও এখন গড়ে উঠেছে বিশাল এক ভার্চুয়াল বাজার। এই বাজারে পণ্যের অভাব নেই, ক্রেতার অভাব নেই, বিজ্ঞাপনেরও অভাব নেই। কিন্তু যার সবচেয়ে বেশি অভাব, সেটি হলো বিশ্বাস।
বাংলাদেশে অনলাইন বেচাকেনা এখন এক বিরাট অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দিনে দিনে বাড়ছে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা, বাড়ছে ডিজিটাল পেমেন্ট, আর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রতারণা। একসময় বাজার মানে ছিল দোকান, দোকানি, আর ক্রেতার চোখে চোখ রেখে লেনদেন। এখন সেই বাজার চলে এসেছে এক স্ক্রিনের মধ্যে—অচেনা এক ‘ডিজিটাল দোকানে’, যেখানে পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে ভুয়া প্রতিশ্রুতি, মিথ্যা হাসি আর নকল ব্র্যান্ড।
প্রতারণা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,আমরা আমাদের পরিচয় ও ফোন নাম্বার অচেনা প্রতারকের হাতে নিজ ইচ্ছায় দিচ্ছি অনলাইনের কৌশলে। অনলাইন বেচাকেনা মানেই যেন অনিশ্চয়তার খেলা। কেউ পোশাক কিনে পাচ্ছেন ছেঁড়া কাপড়, কেউ ফোন অর্ডার দিয়ে পাচ্ছেন সাবান বা ইট, কেউ আবার টাকা পাঠিয়েই হারিয়ে ফেলছেন বিক্রেতার নাম-ঠিকানা। এ যেন এক ভয়াবহ ‘নীরব ডাকাতি’—যা ঘটে আলো-আঁধারির কোনো গলিতে নয়, ঘটে প্রতিদিন কোটি মানুষের ব্যবহৃত ডিজিটাল স্ক্রিনে।
এই প্রতারণার ধরন যেমন বহুমাত্রিক, শিকারও তেমনি বহুবয়সী। কিশোর-তরুণেরা প্রতারিত হচ্ছে অনলাইন গেমিং, বিনিয়োগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা “সহজে টাকা আয়” প্রকল্পে। মধ্যবয়সীরা পড়ছেন ই-কমার্স, চাকরির বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ডেড পণ্যের অফারে। আবার বয়স্ক মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন ব্যাংকিং বা মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিসের ভুয়া কল ও মেসেজে। সবাই ভেবেছেন, “এটা হয়তো সত্যি”—আর ঠিক সেই বিশ্বাসের সুযোগই নিচ্ছে প্রতারক চক্রগুলো।
প্রতারণার মূল শেকড় প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের মনস্তত্ত্বে। মানুষ সহজে কিছু পেতে চায়, দ্রুত লাভে বিশ্বাস করে, ‘অফার’ শব্দ শুনলে উত্তেজিত হয়। প্রতারকরা এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা জানে, মানুষ লোভে নয়, বিশ্বাসেই ফাঁদে পড়ে। তাই ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল রিভিউ, সুন্দর প্যাকেজিং, এবং “অফিশিয়াল লুক” দিয়ে তৈরি করা হয় বিশ্বাসের মায়া। ক্রেতা ভাবে, “এতো সুন্দর ডিজাইন করা, নিশ্চয়ই সত্যি।” অথচ সেই ডিজাইনই প্রতারণার মুখোশ।
একসময় পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপন মানে ছিল নির্ভরযোগ্যতা। বড় ব্র্যান্ড, পরিচিত কোম্পানি, নিবন্ধিত ব্যবসায়ী—এরা সবাই তাদের পণ্য প্রচার করত সংবাদপত্রের মাধ্যমে। মানুষ জানত, পত্রিকার বিজ্ঞাপন মানে কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা আছে। এখন সেই বিজ্ঞাপন হারিয়ে গেছে। সংবাদপত্রের শেষ পাতাগুলো এখন ফাঁকা, কারণ বিজ্ঞাপন চলে গেছে অনলাইনে। পত্রিকার বিজ্ঞাপন কমেছে, কিন্তু প্রতারণার বিজ্ঞাপন বেড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এখন বিজ্ঞাপনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক। এখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই হয় না; শুধু দেখা হয় কে বেশি টাকা দিয়েছে বিজ্ঞাপনের জন্য। ফলে যে কেউ, এমনকি প্রতারকও, টাকা দিলেই তার বিজ্ঞাপন লাখো মানুষের টাইমলাইনে চলে আসে। কেউ ভুয়া ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করছে, কেউ আসল কোম্পানির লোগো কপি করছে, কেউ আবার এমনভাবে ভিডিও বানাচ্ছে যেন সেটা কোনো বিদেশি পণ্য। কিন্তু পেছনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।
আজ পত্রিকার পাতায় পণ্যের বিজ্ঞাপন কমে গেছে, কিন্তু অনলাইনে বিজ্ঞাপনের বন্যা। পার্থক্য একটাই—পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের দায় ছিল, অনলাইনে নেই। পত্রিকার সম্পাদক জানতেন, মিথ্যা বিজ্ঞাপন ছাপালে তার প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোনো সম্পাদক নেই, কোনো যাচাইকারী নেই, কোনো জবাবদিহি নেই। ফলে প্রতারকরা কার্যত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে। তারা আজ এক নামে প্রতারণা করে, কাল অন্য নামে নতুন পেজ খুলে আবার শুরু করে। এই অদৃশ্য বাজারে প্রতারণা যেন এখন এক প্রকার ব্যবসা। নেই দোকান, নেই লাইসেন্স, নেই স্থায়ী ঠিকানা—তবু চলছে কোটি টাকার লেনদেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ‘ছায়াবাজারে’ আইন পৌঁছাতে পারে না, পুলিশ জানে না কাকে ধরবে, আর সাধারণ মানুষ বুঝে ওঠে না কাকে বিশ্বাস করবে। বাংলাদেশে করোনাকালের পর অনলাইন বেচাকেনার অভ্যাস ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মানুষ ঘরে বসেই পণ্য কিনতে শিখেছে, ব্যাংক বা বিকাশে টাকা পাঠিয়ে অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু সেই অভ্যাসের সুযোগ নিয়েছে প্রতারকরা। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ খুব অল্প সংখ্যক মানুষই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে। অনেকে ভাবে—“অভিযোগ দিয়েই বা কি হবে?”—ফলে এই নীরবতা প্রতারণাকে আরও সাহসী করে তোলে। সমস্যা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিকও। যখন সমাজে বারবার প্রতারণা ঘটে এবং কেউ জবাবদিহি করে না, তখন একধরনের বিশ্বাসহীন সংস্কৃতি তৈরি হয়। মানুষ একে অপরকে সন্দেহ করতে শুরু করে, কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ সমাজ টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপরেই। এই বিশ্বাস যখন ক্ষয় হয়, তখন শুধু অনলাইন বাজার নয়, গোটা সামাজিক সম্পর্কই ভেঙে পড়ে।
প্রতারণার অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। একজন ক্রেতা প্রতারিত হলে সে পরেরবার আর অনলাইনে কেনাকাটা করতে চায় না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সৎ ব্যবসায়ীরা, যারা সত্যিকারভাবে অনলাইনে উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। আজ বাংলাদেশে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা সৎভাবে ব্যবসা করছেন, ভালো পণ্য বিক্রি করছেন, কিন্তু কিছু প্রতারকের কারণে সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতার।
রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন বাণিজ্য এখন জাতীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ এখনো দুর্বল। সরকারকে এই খাতকে আনতে হবে নিবন্ধন ও পর্যবেক্ষণের আওতায়। প্রতিটি অনলাইন বিক্রেতার জন্য থাকতে হবে বৈধ ব্যবসায়িক পরিচয়, ট্রেড লাইসেন্স, যোগাযোগের তথ্য ও কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিশেষ সাইবার ইউনিট থাকতে হবে, যারা দ্রুত অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতারক ধরা পড়ে, কিন্তু কিছুদিন পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবার আগের কাজে ফিরে যায়। এই চক্রকে ভাঙতে হলে জরুরি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। তবু এর চেয়ে বেশি জরুরি হলো সচেতনতা—কারণ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, শেষ পর্যন্ত প্রতারণা ঠেকাতে পারে শুধু সচেতন মানুষ।
একজন ক্রেতা যদি জানেন কীভাবে নিরাপদ লেনদেন করতে হয়, তিনি প্রতারিত হবেন না। অজানা ওয়েবসাইটে প্রিপেমেন্ট না করা, অচেনা লিংকে ক্লিক না করা, বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করা—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। স্কুল ও কলেজে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এখন সময়ের দাবি। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের হাতে থাকবে দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ; যদি তারা নিরাপত্তা না জানে, তবে প্রযুক্তি তাদের হাতেই বিপদ হয়ে উঠবে।
প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বও। আমরা অনেক সময় প্রতারণার ঘটনা শুনে হাসাহাসি করি বা বলি “নিজের দোষেই হয়েছে।” কিন্তু ভুলে যাই—এই প্রতারণা একদিন আমাদের কাছেও ফিরে আসতে পারে। সমাজে যখন কেউ নিরাপদ নয়, তখন কেউই আসলে নিরাপদ নয়।
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে বড় পুঁজি টাকা নয়, বিশ্বাস। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু সেই সংযোগকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপাদান হলো সততা। যদি সেটি হারিয়ে যায়, প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, সমাজ ততই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। অনলাইন প্রতারণা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি আমাদের নৈতিকতা, আস্থা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর আঘাত।
আজ প্রয়োজন ডিজিটাল বাজারে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কার। অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে, বিজ্ঞাপনদাতাকে শনাক্তযোগ্য করতে হবে, আর প্রতিটি প্ল্যাটফর্মকে আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রতারণা চলতেই থাকবে, আর সাধারণ মানুষ হারাবে আরও অনেক কিছু—অর্থ, সময়, আত্মবিশ্বাস, এমনকি সমাজের প্রতি আস্থা।
একটি সমাজ তখনই টিকে থাকে, যখন সেখানে সততার দাম থাকে। অনলাইন বেচাকেনা এখন শুধু বাণিজ্য নয়, এটি আমাদের সভ্যতার পরীক্ষা। আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করব মানবকল্যাণে, নাকি প্রতারণার অস্ত্রে পরিণত করব—সেই সিদ্ধান্ত এখন আমাদেরই নিতে হবে। বিশ্বাসই এই যুগের নতুন মুদ্রা। এই বিশ্বাস যদি আমরা হারাই, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশও কেবল প্রযুক্তির খোলস হয়ে থাকবে, যার ভেতর থাকবে শূন্যতা, সন্দেহ আর ক্ষোভ। তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—বিক্রি করব শুধু পণ্য নয়, বিক্রি করব সততা, বিশ্বাস আর মানবিকতা। কারণ শেষ পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে মূল্যবান পণ্য—যা কিনে পাওয়া যায় না, কিন্তু হারালে সবকিছু হারিয়ে যায়।

মোঃ শামীম মিয়া, শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ ও কলামিস্ট, আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা।

Shamimmiabd94@gmail.com